নরসিংদীতে তিন মাসের শিশুর পা মুচড়ে পৈশাচিক নির্যাতন,দাদা ও চাচা গ্রেফতার, পলাতক চাচি
নরসিংদীতে তিন মাসের শিশুর পা মুচড়ে পৈশাচিক নির্যাতন: দাদা ও চাচা গ্রেফতার, পলাতক চাচি![]() |
| ছবি :সংগৃহীত |
নরসিংদীর মাধবদীতে মাত্র তিন মাস বয়সী এক অবুঝ শিশুর ওপর চরম পৈশাচিকতার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ঘুমন্ত এক নবজাতকের পা নির্মমভাবে মুচড়ে দেওয়ার একটি হাড়হিম করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র নিন্দার ঝড় ওঠে। এই বর্বরোচিত ঘটনায় অবশেষে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, খোদ ভুক্তভোগী শিশুর মা-বাবার পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। উল্টো তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা রিজা আক্তারের উদ্যোগে মাধবদী থানায় শিশু সুরক্ষা আইনে একটি সময়োপযোগী মামলা রুজু করা হয়েছে।প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, এই চাঞ্চল্যকর মামলায় মোট তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশি তৎপরতায় ইতোমধ্যেই শিশুটির আপন চাচা কাউছার আহম্মেদ এবং দাদা আলমাছ মিয়াকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে মূল অভিযুক্ত, যিনি ভিডিওতে নিজ হাতে অবুঝ শিশুটির পা মুচড়ে দিচ্ছিলেন, সেই পাষণ্ড চাচি লতা বেগম (৩২) ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তাকে ধরতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত আছে।ঘটনার প্রেক্ষাপট ও এজাহার থেকে জানা যায়, মাধবদী থানাধীন আমদিয়া ইউনিয়নের পাইকারদী গ্রামের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম ও সাইফা আক্তার দম্পতির কোল আলো করে আসা তিন মাসের ফুটফুটে সন্তান রিজিক। জন্মের পর থেকেই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিল শিশুটি। অসুস্থ সন্তানের দেখভাল করতে গিয়ে মা সাইফা আক্তার যৌথ পরিবারের দৈনন্দিন কাজকর্মে ঠিকমতো সময় দিতে পারতেন না। আর এই তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করেই আপন জা ও শিশুটির চাচি লতা বেগমের সঙ্গে তার প্রায়শই ঝগড়াঝাঁটি ও বাগবিতণ্ডা হতো। কে জানত, এই সাধারণ পারিবারিক কলহের জেরে তিন মাসের এক শিশুর ওপর এমন বীভৎস রূপ ধারণ করবে প্রতিহিংসা!গত শনিবার, ১১ জুলাই বিকেলের ঘটনা। শিশু রিজিককে নিয়ে নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মা সাইফা আক্তার। একপর্যায়ে তিনি ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য ওঠেন। তবে পরিবারের ভেতরের সন্দেহজনক পরিবেশ আঁচ করতে পেরে তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজের স্মার্টফোনের ভিডিও ক্যামেরাটি চালু করে ঘরের এক কোণে লুকিয়ে রেখে যান। তার এই একটি পদক্ষেপই পরে উন্মোচন করে এক ভয়ংকর রূপ। ভিডিওতে পরিষ্কার দেখা যায়, মা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই পাষণ্ড চাচি লতা বেগম সেখানে প্রবেশ করেন এবং ঘুমন্ত শিশুটির নরম পা দুটি ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে মুচড়ে ভেঙে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। ওয়াশরুম থেকে ফিরে মোবাইলের ধারণকৃত ওই দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠেন সাইফা।কিন্তু এখানেই শেষ নয়, ঘটনার পর শুরু হয় পারিবারিক চাপ ও লোকলজ্জার দোহাই দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা। শিশুটির দাদা আলমাছ মিয়া এবং চাচা কাউছার আহম্মেদ মিলে জোরপূর্বক সাইফার মোবাইল থেকে প্রমাণস্বরূপ ওই ভিডিওটি মুছে ফেলেন এবং অভিযুক্ত লতা বেগমকে বাড়ি থেকে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সার্বিক সহায়তা করেন। তবে তারা জানতেন না যে, এর আগেই চতুর সাইফা আক্তার ভিডিওটি অত্যন্ত সন্তর্পণে তার ভাইয়ের মোবাইলে পাঠিয়ে সুরক্ষিত করেছিলেন।পরবর্তীতে গত মঙ্গলবার দুপুরে সেই লোমহর্ষক ভিডিওটি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তবে এত কিছুর পরও শিশুটির বাবা জহিরুল ও মা সাইফার ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। তারা গণমাধ্যমকে জানান, এটি একান্তই তাদের নিজস্ব পারিবারিক ব্যাপার এবং তিন দিন আগেই তারা পারিবারিকভাবে বসে বিষয়টি আপস-মীমাংসা করে নিয়েছেন। তাদের দাবি, শিশু রিজিক বর্তমানে সুস্থ আছে এবং তার পা ভাঙেনি। তারা কারও বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিতে নারাজ। উল্টো তারা দাবি করেন যে, ফেসবুকে অতিরঞ্জিত ও মনগড়া তথ্য দিয়ে ভিডিওটি প্রচার করা হচ্ছে।এ প্রসঙ্গে মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ফেসবুকে ভিডিওটি নজরে আসার পরপরই পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্তে নামে। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায় যে, শিশুর পা পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার দাবিটি সত্য নয় এবং মা-বাবার বক্তব্যের সঙ্গে ভাইরাল হওয়া তথ্যের কিছুটা অমিল রয়েছে। তা সত্ত্বেও, তিন মাসের এক দুধের শিশুর ওপর এমন নির্যাতন চরম অমানবিক ও দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তাকে বাদী করে ২০১৩ সালের শিশু আইনে মামলাটি রুজু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দুজনকে আটক করা হয়েছে এবং প্রধান আসামি লতা বেগমকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতারে অভিযান চলমান আছে।মামলার বাদী ও সমাজসেবা কর্মকর্তা রিজা আক্তার তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, 'সব অপরাধ কেবল পারিবারিকভাবে বসে মীমাংসা করার সুযোগ নেই। শিশু নির্যাতনের যে ভয়াবহ দৃশ্য ভিডিওতে উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং জঘন্য অপরাধ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি নির্দেশনায় আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি এবং শিশুটির সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আইনের আশ্রয় নিয়েছি।' সচেতন মহলের দাবি, এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ কোনো অবুঝ শিশুর ওপর এমন নির্মমতা প্রদর্শনের সাহস না পায়।

