দেশের ১৬ জেলায় আকস্মিক বন্যার চরম সতর্কতা, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমা পার হতে পারে তিস্তা
আগামী ৭২ ঘণ্টায় তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বেড়ে ১৬ জেলায় বন্যার আশঙ্কা। উজানে ভারী বৃষ্টির কারণে পাউবো এই জরুরি সতর্কতা জারি করেছে।
দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নতুন করে চোখ রাঙাচ্ছে বন্যা পরিস্থিতি। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব এলাকার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উত্তরের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত তিস্তা নদীর পানি যেকোনো সময় বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে, যার ফলে দেশের অন্তত ১৬টি জেলার নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক ও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার, ৭ জুলাই বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ নদ-নদী ও বৃষ্টিপাত বিষয়ক বুলেটিনে এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি এই সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, এই মুহূর্তে দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পানি সমতল পর্যবেক্ষণের জন্য নির্ধারিত ১২৭টি স্টেশনের মধ্যে মাত্র ৩৮টিতে পানি বৃদ্ধির রেকর্ড পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ৮৬টি স্টেশনে পানি কমেছে এবং ৩টি স্টেশনের পানি সমতল অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে এই আপাত শান্ত পরিস্থিতির দ্রুতই অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা আবহাওয়াবিদদের। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ভারতের উজানে হওয়া মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাতকে দায়ী করা হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মাওকিরওয়াতে ১৫৩ মিলিমিটার, রামকৃষ্ণ মিশন সোহরায় ১৪১ মিলিমিটার এবং চেরাপুঞ্জিতে ১৩৩ মিলিমিটার ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরামেও ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। উজানের এই বিপুল পরিমাণ পানি ঢল হয়ে বাংলাদেশের নদীগুলোতে প্রবেশ করতে শুরু করেছে, যা আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বন্যা পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সতর্কবার্তায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগামী এক থেকে তিন দিনের মধ্যে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গোমতী, মুহুরি, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু এবং মাতামুহুরী নদীর পানি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এই নদীগুলোর পানি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং খাগড়াছড়ি জেলার বেশ কিছু এলাকায় বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাবে এসব জেলার নদী অববাহিকায় বসবাসরত মানুষদের স্বল্পমেয়াদি বন্যার কবলে পড়তে হতে পারে। শুধু তাই নয়, লক্ষ্মীপুর এবং নোয়াখালী জেলার নিচু এলাকাগুলোও এই পাহাড়ি ঢলের কারণে সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর জন্যেও কোনো সুখবর নেই। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর এবং ময়মনসিংহ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে এসব জেলার নদী তীরবর্তী নিচু অঞ্চলগুলোতে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু ধ্বংসাত্মক বন্যা দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ হতে পারে রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে। এই অঞ্চলের তিস্তা, ধরলা এবং দুধকুমার নদীর পানি আগামী তিন দিনের মধ্যে লাগামহীনভাবে বাড়তে পারে। এর মধ্যে তিস্তা নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বিপৎসীমা অতিক্রম করার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে নীলফামারী এবং লালমনিরহাট জেলার নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী লাখো মানুষ আকস্মিক বন্যার মুখে পড়তে পারে। একই সময়ে ধরলা এবং দুধকুমার নদীর পানিও আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা প্লাবিত করতে পারে। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে নদী তীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি জানমালের নিরাপত্তায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

