চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। তার সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে আর কোনো আইনি বাধা রইল না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে চট্টগ্রাম-২ আসনের রাজনৈতিক ও আইনি টানাপোড়েনের অবশেষে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। এই আসনে ধানের শীষের বিজয়ী প্রার্থী এবং বিএনপির হেভিওয়েট নেতা সারোয়ার আলমগীরের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণে আর কোনো আইনি জটিলতা বা বাধা রইল না। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ তার প্রার্থিতাকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করেন। এর আগে এই রিট মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিনটি নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। আদালত কক্ষে রিটকারীর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা। সারোয়ার আলমগীরের পক্ষে জোরালো আইনি যুক্তি তুলে ধরেন প্রখ্যাত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রভাবশালী নেতা ব্যারিস্টার এ. এম. মাহবুব উদ্দিন খোকন। তাদের সার্বক্ষণিক আইনি সহযোগিতা প্রদান করেন আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন। অপরদিকে, এই আসনে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিনের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির এবং আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী। নির্বাচনী এই আইনি দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল বেশ আগে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে বিএনপির টিকিট নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন সারোয়ার আলমগীর। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের একপর্যায়ে নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থিতা বাতিল করে দেয়। এরপর নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার ও প্রার্থিতা ফিরে পেতে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। তার দায়ের করা রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন। ওই রুলে সারোয়ার আলমগীরকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান এবং তাকে দলীয় প্রতীক ধানের শীষ বরাদ্দ দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্টের এই নির্দেশনার পরেই শুরু হয় নতুন আইনি লড়াই। হাইকোর্টের আদেশের বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করেন ওই একই আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন। তার মূল অভিযোগ ছিল, সারোয়ার আলমগীর একজন ঋণখেলাপি, তাই তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ একটি যুগান্তকারী আদেশ প্রদান করেন। সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দেন, যদি সারোয়ার আলমগীর ভোটের মাঠে বিজয়ীও হন, তবুও আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার ক্ষেত্রে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে। এই আদেশের ধারাবাহিকতায় গত ৩১ মার্চ জামায়াতের প্রার্থী নিয়মিত আপিল দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ১৬ জুন আপিল বিভাগ শুনানি শেষে একটি আদেশ দেন, যেখানে হাইকোর্টকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দ্রুততম সময়ে রুল নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি এ-ও জানিয়ে দেওয়া হয় যে, হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল স্থগিত রাখার পূর্ববর্তী আদেশটিই বহাল থাকবে। আপিল বিভাগের এই কঠোর নির্দেশনার পর গত ২১ জুন রিট মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির জন্য হাইকোর্টের কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সেদিন আদালত রুল শুনানির জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন ধার্য করেছিলেন। পরবর্তীতে ধারাবাহিক ও চুলচেরা আইনি শুনানি শেষে আজ আদালত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন। এই রায়ের মাধ্যমে সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা কেবল বৈধতা পেল না, বরং তার সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পথও চিরতরে সুগম হলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের এই রায় চট্টগ্রাম-২ আসনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করবে।

