বিজ্ঞাপনের মডেল থেকে দাপুটে অভিনেতা: ফারজাদ জুলফিকারের এক অন্যরকম শোবিজ যাত্রা
নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা ফারজাদ জুলফিকারের শোবিজ অঙ্গনে এক ব্যতিক্রমী পথচলা। বিজ্ঞাপনের মডেলিং থেকে খল চরিত্রে তাঁর অনন্য অভিনয় বিস্তারিত জানুন।
![]() |
| জীবনের প্রথম সূচনা সিংগার ল্যাপটপ 'হিরো যখন ক্যাম্পাস' দিয়ে: ফারজাদ জুলফিকার |
বিনোদন জগতের এক অন্যরকম গল্পের পাতা উন্মোচন করতে আজ আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি এমন একজন গুণী শিল্পীর জীবনকাহিনি, যিনি চিরাচরিত ইঁদুর দৌড়ে বিশ্বাসী নন। তিনি ফারজাদ জুলফিকার। বাংলাদেশের ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন এবং মিডিয়া অঙ্গনে বিগত প্রায় দুই দশক ধরে নীরবে অথচ অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে নিজের এক অনবদ্য অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। ঢাকা শহরে জন্ম নেওয়া এবং নব্বইয়ের দশকে পুরোনো ও নতুন ঢাকার মিশ্র সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা এই প্রতিভাবান শিল্পী এখনো শোবিজ অঙ্গনে নিজের চিরসবুজ অস্তিত্ব বজায় রেখেছেন। ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুর দিকে তিনি দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফ্যাশন শুট, প্রিন্ট মিডিয়া, টেলিভিশন কমার্শিয়াল এবং অনলাইন ভিডিও কমার্শিয়ালে কাজের মাধ্যমে নিজেকে একজন তুমুল সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেটিও তাঁর অভিনয় ও মিডিয়া ক্যারিয়ারের সঙ্গে সম্পূর্ণ মানানসই। ২০১৫ সালে ভারতের কলকাতার বিখ্যাত জর্জ কলেজ থেকে ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া সায়েন্সের ওপর তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ফারজাদের মিডিয়া ক্যারিয়ারের প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্রেক থ্রু আসে 'সিংগার ল্যাপটপ'-এর একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। ইউনিট্রেন্ডের নির্মাণে 'হিরো যখন ক্যাম্পাসে' শীর্ষক সেই প্রিন্ট এবং বিলবোর্ড বিজ্ঞাপনটি সেসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এই অভাবনীয় সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই তাঁকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয় ব্র্যান্ড 'প্রাণ ফ্রুটো জুস'-এর টেলিভিশন বিজ্ঞাপন এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিলবোর্ডগুলোতে প্রথম একক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে দেখা যায়। অভিনয়ের আঙিনায় তাঁর আনুষ্ঠানিক পদার্পণ ঘটে ২০০৮ সালে। চ্যানেল আইয়ের পর্দায় সম্প্রচারিত এবং গুণী নির্মাতা সাইফুল ইসলাম মান্নুর পরিচালনায় একটি ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে তিনি টেলিভিশন অভিনয়ে নিজের খাতা খোলেন। এরপর তিনি বেশ কয়েকটি টেলিভিশন প্রোডাকশনে কাজ করলেও, নিজের পেশাদারি জ্ঞানকে আরও শাণিত করার জন্য ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ভারতে পড়াশোনা ও মিডিয়া বিষয়ক শিক্ষানবিশ হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ২০১৫ সালে দেশে ফিরে আসার পর ফারজাদের মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন স্বনামধন্য বিজ্ঞাপন সংস্থা এবং পরিচালনায় যুক্ত হওয়া। তবে মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁকে ক্যামেরার পেছনে নয়, বরং ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের দিকেই বেশি উৎসাহিত করেন। তাঁদের অনুপ্রেরণায় তিনি শুভ্র খানের পরিচালনায় আরটিভির 'অনাকাঙ্ক্ষিত সত্য' নামক একটি নাটকে দুর্দান্ত অভিনয় করেন। এরপরই ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। কোনো এক অজানা কারণে মিডিয়া জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন ফারজাদ। দীর্ঘ একটি বিরতির পর, করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ২০২১ সালে তিনি পুনরায় অভিনয়ে ফিরে আসেন। তবে এই ফেরাটা ছিল অনেকটাই শখের বশে এবং এক্সপেরিমেন্টাল। তরুণ ও প্রতিভাবান নির্মাতা নাজমুল হুদা ইমনের উৎসাহে মেগা ধারাবাহিক 'কুল এজ'-এর মাধ্যমে তিনি শোবিজে নিজের রাজসিক প্রত্যাবর্তন ঘোষণা করেন। একই পরিচালকের নাটক 'এসএমএস' এবং ক্লাব ১১ এন্টারটেইনমেন্টের প্রযোজনায় জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়াউল হক পলাশের সঙ্গে 'ভ্যানিশিং ম্যান' ও 'ভ্যানিশিং ম্যান রিটার্নস'-এ তাঁর অভিনীত 'ফারজাদ ব্রো' চরিত্রটি দর্শক মহলে রীতিমতো উন্মাদনার সৃষ্টি করে। একজন বিচিত্র ড্রাগ ডিলারের চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। পাশাপাশি বুম ফিল্মসের প্রথম নাটক 'কমেন্ট সেন্স'-এ তিনি একজন মেগাস্টার চিত্রনায়কের চরিত্রে অভিনয় করে সবার নজর কাড়েন। এর বাইরে এলজি টেলিভিশনের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনেও তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ফারজাদ জুলফিকারের অভিনয় দর্শন অত্যন্ত স্পষ্ট এবং স্বতন্ত্র। তিনি গতানুগতিক ধারার নায়ক বা প্রোটাগনিস্ট হতে কখনোই চান না। তাঁর আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো আভিজাত্যপূর্ণ এন্টাগনিস্ট বা নেগেটিভ চরিত্র এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে ভরপুর স্বাধীন কোনো চরিত্র। নাটকের চরিত্র, তার রুচি, ব্যক্তিত্ব এবং পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে তিনি কখনোই কোনো আপস করেন না। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ হলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি মহানায়ক উত্তম কুমার, উৎপল দত্ত, রাজীব, জাফর ইকবাল, সালমান শাহ, গোলাম মোস্তফা এবং বলিউডের ড্যানি ডেনজংপা। ক্যামেরার সামনের পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনেও ফারজাদ একজন অত্যন্ত দক্ষ ব্যক্তিত্ব। ২০২৪ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য অমিত মালপানির প্রযোজনায় নির্মিত ভারতীয় চলচ্চিত্র 'জাগান'-এর কলকাতা অংশে তিনি প্রোডাকশন কো-অর্ডিনেটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। একই বছরের মার্চ মাসে ভারতীয় চ্যানেল স্টার জলসা থেকে একটি সিরিয়ালের প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেলেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভিসা জটিলতার কারণে সেই সুবর্ণ সুযোগটি তাঁর হাতছাড়া হয়। ২০২৫ সালের শুরু থেকেই তিনি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বঙ্গ-তে বেশ কিছু নন-ফিকশন প্রজেক্ট এবং রিয়েলিটি শোয়ের ফ্রিল্যান্স সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি তিনি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং ইনফ্লুয়েন্সার ম্যানেজমেন্টের মতো আধুনিক ডিজিটাল পেশার সঙ্গেও জড়িত রয়েছেন। ফারজাদ স্বপ্ন দেখেন, ভবিষ্যতে ভালো গল্প এবং শক্তিশালী চরিত্র পেলে তিনি ওয়েব ফিল্ম এবং ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে নিজের অভিনয় জীবনের এক নতুন ও আন্তর্জাতিক অধ্যায় শুরু করবেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন নিরীহ ভালো মানুষের চেয়ে একটি চ্যালেঞ্জিং ও বৈচিত্র্যময় খল চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের ভালোবাসা অর্জন করাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। নিজেকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করার জন্য তিনি নিয়মিত বই পড়েন, মানসম্মত সিনেমা এবং আন্তর্জাতিক ওয়েব সিরিজ দেখেন। ইঁদুর দৌড়ের এই যুগে নিজেকে একটি নির্দিষ্ট ছকে বন্দি না রেখে, সম্পূর্ণ নিজস্ব গতিতে সৃজনশীলতার মাধ্যমে স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে চলেছেন ফারজাদ জুলফিকার। আর এই নিরন্তর পথচলাকেই তিনি তাঁর শিল্পীসত্তার প্রধান খোরাক বলে মনে করেন।

