ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ডাকসুর নতুন দৃষ্টান্ত: উন্মোচিত হলো তিন ঐতিহাসিক স্মারকগ্রন্থ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসুর উদ্যোগে তিনটি ঐতিহাসিক স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচিত। কালচারাল ফ্যাসিজম ভাঙার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন নেতৃবৃন্দ।![]() |
উন্মোচিত হলো তিন ঐতিহাসিক স্মারকগ্রন্থ, |
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসে এক নতুন এবং অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং ফ্যাসিবাদী বয়ানকে ভেঙে ফেলার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ১১ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় ডাকসু ভবনের সভাকক্ষে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের সুদক্ষ সম্পাদনায় প্রকাশিত এই গ্রন্থগুলো হলো 'তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা থেকে জুলাইয়ের নিরস্ত্র জনতার প্রতিরোধ', 'রক্তের আখরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়' এবং ডাকসু সাহিত্য পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যা 'প্রতিভাস'। বর্ণাঢ্য এই আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে আসন অলংকৃত করেন মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব নুরুল ইসলাম বুলবুল। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ভিপি জনাব সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি কাজী আশিকসহ ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নুরুল ইসলাম বুলবুল তাঁর বক্তব্যে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করেন। তিনি বলেন, একটি জাতির আত্মপরিচয় ও লড়াইকে টিকিয়ে রাখতে সাহিত্য এবং সংস্কৃতির চর্চা অপরিহার্য। ডাকসু আজ দলমত নির্বিশেষে সকল মতাদর্শের শিক্ষার্থীকে একই ছাদের নিচে এনে যে অসামান্য নজির স্থাপন করেছে, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এক অনন্য শিক্ষণীয় বিষয়। তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাসে পূর্ববর্তী ৩৮টি ডাকসু সম্মিলিতভাবে যে কাজ করেছে, বর্তমান ডাকসুর এই অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ তার চেয়েও বহুগুণ বেশি কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী। এরপর ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম তাঁর বক্তব্যে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনাকে পরাজিত করা সম্ভব হলেও, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা কালচারাল ফ্যাসিজম বা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের শেকড় এখনো পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ডাকসুর এই নতুন প্রকাশনাগুলো সেই ফ্যাসিবাদের ভিত্তিপ্রস্তর গুঁড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় শিক্ষার্থীদের স্মরণ করে তিনি জানান, সংস্কৃতির ময়দানে আমাদের এই নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, তবেই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন সম্ভব। অন্যদিকে, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক বা জিএস এস এম ফরহাদ গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সত্যিকার অর্থেই বর্তমান ডাকসু সকল পক্ষের মত ও পথকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি দৃষ্টান্ত হিসেবে 'রক্তের আখরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়' বইটির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে চরম নির্মমতার শিকার হওয়া নজির আহমেদ, আবদুল মালেক থেকে শুরু করে ছাত্র ইউনিয়নের মঈন হোসেন রাজু, আবুবকর, হাফিজুর মোল্লা এবং ছাত্রদলের সাম্যসহ সকল শহীদদের স্মৃতি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে ডাকসুর নিরপেক্ষতা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের জন্য সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিককে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখতে গিয়ে গ্রন্থগুলোর সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক এবং বার্ষিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের যে প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছিলেন, এই মোড়ক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে তা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলো। তিনি জানান, 'রক্তের আখরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়' বইটির প্রধান লক্ষ্য হলো আধিপত্যবাদ, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সর্বদা জাগ্রত রাখা। পাশাপাশি 'তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা থেকে জুলাইয়ের নিরস্ত্র জনতার প্রতিরোধ' গ্রন্থটিকে তিনি জুলাই বিপ্লবের ওপর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও গবেষণামূলক দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেন। রিয়াদুল ইসলাম যুবার প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় আয়োজিত এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে গ্রন্থগুলোর সহ-সম্পাদক মাহিয়া বিনতে মামুন, সাইমুম ফেরদৌস সৌরভ, আশফাকউল্লাহ আসিফসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অসংখ্য সাধারণ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। সব মিলিয়ে এই আয়োজনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নতুন জাগরণের সূচনা করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।




