ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসুর উদ্যোগে 'বহুমাত্রিক' ও 'হাতেখড়ি' গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন
ঢাবিতে ডাকসুর উদ্যোগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্য সংকলন 'বহুমাত্রিক' ও নবীনদের লেখা 'হাতেখড়ি' গ্রন্থের ঐতিহাসিক মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।![]() |
ডাকসুর উদ্যোগে 'বহুমাত্রিক' ও 'হাতেখড়ি' গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন |
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর উদ্যোগে প্রকাশিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত দশটায় অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে প্রকাশ্যে আসে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষাভিত্তিক সাহিত্য সংকলন 'বহুমাত্রিক' এবং ডাকসুর লেখালেখি ও নাট্য কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী নবীন শিক্ষার্থীদের স্বরচিত লেখা নিয়ে তৈরি সংকলন 'হাতেখড়ি'। ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের নিপুণ সম্পাদনায় গ্রন্থ দুটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই বর্ণাঢ্য মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন ডাকসুর বর্তমান ভিপি জনাব আবু সাদিক কায়েম। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মহিউদ্দিন খান এবং ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মোশাররফ হোসেন মুন্না। তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন হল সংসদের প্রতিনিধি ও ডাকসুর অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হন। অনুষ্ঠানে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ তার বক্তব্যে বলেন, ডাকসু যে কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নয়, বরং দলমত ও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের অধিকার ও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার প্ল্যাটফর্ম, এই প্রকাশনা তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি গভীর উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেন যে, চাকমা, মারমা, ম্রো, সাঁওতালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলো আজ চর্চার অভাবে বিলুপ্তির পথে।
এই হারিয়ে যেতে বসা অমূল্য ভাষাসমূহকে রক্ষা করতে এবং সেগুলোর সাহিত্যিক রূপকে সংরক্ষণ করার তাগিদেই ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের এই মহতী উদ্যোগ। 'অবাঙালি মাতৃভাষার স্মারকগ্রন্থ' হিসেবে 'বহুমাত্রিক'-এর প্রকাশকে তিনি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পাশাপাশি তিনি 'হাতেখড়ি' গ্রন্থটির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘ কর্মশালার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল লেখালেখির যে পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, তারই চূড়ান্ত ফসল এই গ্রন্থ। যাচাই-বাছাইকৃত মানসম্মত লেখাগুলোর সমন্বয়ে প্রকাশিত এই সংকলনটি তরুণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ লেখক হিসেবে গড়ে তুলতে অপরিসীম অনুপ্রেরণা জোগাবে। তিনি আরও জানান যে, ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ ইতোমধ্যেই ডাকসুর পৃষ্ঠপোষকতায় ২৭টি ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থ সম্পাদনা করে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে অভাবনীয়ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। গ্রন্থ দুটির সফল রূপকার ও ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ তার বক্তব্যে সকলের সমান অধিকার ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির আঙিনায় সবার অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করা হবে। বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের পাশাপাশি মূলধারার বাইরে থাকা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংরক্ষণের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী তাদের নিজেদের মাতৃভাষার লিখিত রূপ সম্পর্কেও অবগত নন। এই করুণ বাস্তবতাকে পরিবর্তন করার লক্ষ্যেই চাকমা, ম্রো, সাঁওতাল ভাষার ছোটগল্প, কবিতা ও প্রবন্ধের অপূর্ব সংমিশ্রণে 'বহুমাত্রিক' গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয়েছে। 'হাতেখড়ি' প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, প্রায় সাড়ে সাতশ আগ্রহী শিক্ষার্থীকে নিয়ে ডাকসুর উদ্যোগে এক মাসব্যাপী একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ লেখালেখি কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল।
সেখানে নবীনদের সাহিত্য রচনার বিভিন্ন কলাকৌশল ও গাইডলাইন প্রদান করা হয়। সেই প্রশিক্ষণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শিক্ষার্থীরা যেসব মৌলিক লেখা জমা দিয়েছেন, তার মধ্য থেকে সর্বোৎকৃষ্ট লেখাগুলো বাছাই করেই 'হাতেখড়ি' স্মারকগ্রন্থটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। মূলত সাহিত্যের আঙিনায় নতুন প্রতিভাদের প্রথম সার্থক পদচারণাকে স্মরণীয় করে রাখতেই এর নামকরণ করা হয়েছে 'হাতেখড়ি'। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই নবীন লেখকরা পাঠকদের ভালোবাসা ও উৎসাহ পেয়ে একদিন দেশের প্রথম সারির পরিপক্ব লেখকে পরিণত হবেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদকে সহ-সম্পাদক হিসেবে নিরলসভাবে সহায়তা করেছেন আসিফ আব্দুল্লাহ, ফাতিমা তাসনিম জুমা, মাহিয়া বিনতে মামুন, রিয়াদুল ইসলাম যুবা, রিজওয়ান য্যুবরান মানসূরী, নুসরাত জাহান, সায়মুম ফেরদৌস, আসফাকউল্লাহ আসিফ এবং সুহাইল মাহদীন। অন্যদিকে, 'হাতেখড়ি' স্মারক গ্রন্থের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মশালা পরিচালনার গুরুদায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করেছেন বাংলাদেশ সাহিত্যকেন্দ্রের সভাপতি ও প্রখ্যাত কবি আফসার নিজাম এবং নটনাট্যের সভাপতি ও খ্যাতিমান নাট্য নির্দেশক হুসনে মোবারক। সর্বস্তরের শিক্ষার্থী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ডাকসুর এই ব্যতিক্রমী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সাহিত্য উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।



