অভিনন্দন! আপনি প্রতারিত হয়েছেন
একসময় ডাকপিয়ন সুখবর এনে দিত। এখন সুখবর আসে মোবাইলের পর্দায়।
"অভিনন্দন! আপনি পাঁচ লক্ষ টাকা জিতেছেন!"
বার্তাটি পড়েই মনে হলো—আমার ভাগ্যের দেবী বোধহয় বহুদিন পর ঠিকানাটা খুঁজে পেয়েছেন। জীবনে এতদিন যত পরীক্ষায় ফেল করেছি, যত চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে "দুঃখিত" শব্দটি পেয়েছি, সব কষ্ট বুঝি এক নিমেষে ধুয়ে গেল। শুধু একটি নম্বরে ফোন করলেই আমি লাখপতি!
অদ্ভুত এক দেশ আমরা গড়ে তুলেছি। এখানে মানুষ পরিশ্রম করে ধনী হওয়ার চেয়ে, ভাগ্যের শর্টকাটে ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে বেশি ভালোবাসে। আর সেই স্বপ্নের গলিপথেই দাঁড়িয়ে থাকে কিছু হাসিমুখের প্রতারক—যাদের মুখ দেখা যায় না, কিন্তু কণ্ঠে থাকে এমন মধু, যেন তারা বহুদিনের আত্মীয়।
তারা বলে, "স্যার, আপনার বিকাশ অ্যাকাউন্টটি নিরাপত্তার স্বার্থে আপডেট করতে হবে।"
আমরা ভাবি, আহা! কী দায়িত্ববান মানুষ! পৃথিবীতে এখনও এমন লোক আছে, যারা আমার টাকার নিরাপত্তা নিয়ে রাত জেগে চিন্তা করে!
এরপর তারা এমন ভদ্রভাবে তথ্য জানতে চায়, যেন আমার জন্মদিনের কেক কাটতে যাচ্ছে। আর আমরা এমন আন্তরিকভাবে ওটিপি বলে দিই, যেন জাতীয় কবিতা আবৃত্তি করছি।
অবাক লাগে, প্রযুক্তি যত স্মার্ট হয়েছে, প্রতারণাও ততই ভদ্র হয়েছে। আগে চোর রাতের অন্ধকারে জানালা ভাঙত। এখন সে দিনের আলোয় ফোন করে বলে, "স্যার, ভয় পাবেন না। আমি ব্যাংক থেকে বলছি।"
সবচেয়ে মজার বিষয়, প্রতারক কখনো নিজের পরিচয় দেয় না—আমরাই তাকে পরিচয় দিয়ে দিই। সে শুধু বলে, "আমি অফিস থেকে বলছি।"
আমরা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করি, "কোন অফিস? বিদ্যুৎ, ব্যাংক, মোবাইল, না আয়কর?"
প্রতারক তখন বুঝে যায়—দরজা নয়, পুরো বাড়িটাই খোলা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণারও এখন রাজকীয় আয়োজন। কেউ লিখেছে, "মাত্র পাঁচশ টাকায় আইফোন।" আর আমরা মন্তব্য করি, "ভাই, স্টক আছে?"
কেউ বলে, "আগে টাকা পাঠান, পরে পণ্য।" আমরা টাকা পাঠাই। তারপর পণ্য তো দূরের কথা, বিক্রেতার প্রোফাইলটিও যেন মহাকাশযানে চড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
তারপর শুরু হয় আমাদের বিখ্যাত সংলাপ— "মানুষকে এত বিশ্বাস করলাম, এই তার প্রতিদান!"
আসলে আমরা মানুষকে বিশ্বাস করি না; আমরা বিশ্বাস করি নিজের লোভকে। সেই লোভের গায়ে শুধু "বিশ্বাস" নামের একটি সুন্দর জামা পরিয়ে দিই।
তবে সব প্রতারণার গল্প লোভের নয়। অনেক সময় মানুষের সরলতাও অপরাধীদের সবচেয়ে বড় মূলধন হয়ে ওঠে। গ্রামের বৃদ্ধ বাবা ভাবেন, ফোনের ওপাশে সত্যিই ছেলে বিপদে পড়েছে। একজন মা ভাবেন, হাসপাতাল থেকে কল এসেছে। একজন চাকরিপ্রার্থী বিশ্বাস করেন, এবার বুঝি চাকরিটা সত্যিই হবে।
প্রতারক টাকা চুরি করে, কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষতি করে মানুষের বিশ্বাস চুরি করে। এরপর একজন প্রকৃত বিপদগ্রস্ত মানুষ সাহায্য চাইলে আমরা দশবার সন্দেহ করি। একজন সত্যিকারের বিক্রেতাও ক্রেতার অবিশ্বাসের শিকার হন। একটি প্রতারণা শুধু একটি ব্যাংক হিসাব খালি করে না; একটু একটু করে সমাজের আস্থার ভাণ্ডারও খালি করে দেয়।
আমরা আজকাল পাসওয়ার্ড বদলাই, পিন বদলাই, ওটিপি লুকাই—কিন্তু সবচেয়ে প্রয়োজন যে জিনিসটি বদলানো, সেটি হলো অযাচিত বিশ্বাস আর অবাস্তব লাভের মোহ।
কারণ পৃথিবীতে এমন কোনো লটারি নেই, যেখানে টিকিট না কেটেই প্রথম পুরস্কার পাওয়া যায়। এমন কোনো ব্যাংকও নেই, যারা আপনার গোপন পিন জানতে ফোন করে। আর এমন কোনো অলৌকিক ব্যবসাও নেই, যেখানে পরিশ্রম ছাড়াই রাতারাতি সম্পদ এসে দরজায় কড়া নাড়ে।
তাই পরেরবার যদি আপনার ফোনে ভেসে ওঠে—
"অভিনন্দন! আপনি বিজয়ী হয়েছেন!"
তবে একটু থামুন।
হয়তো আপনি সত্যিই বিজয়ী নন।
হয়তো পরীক্ষায় বসেছেন।
আর সেই পরীক্ষার প্রশ্ন মাত্র একটি—
আপনি কি আপনার বুদ্ধিকে বিশ্বাস করবেন, নাকি প্রলোভনকে?
সঠিক উত্তর দিতে পারলে অভিনন্দন।
আপনি শুধু টাকা নয়, নিজের বিবেক, সতর্কতা এবং সমাজের প্রতি দায়বোধও রক্ষা করতে পারবেন।
আর যদি ভুল উত্তর দেন…
তবে পর্দার ওপাশে কেউ হয়তো ইতিমধ্যেই মুচকি হেসে বলছে—
"অভিনন্দন! আপনি প্রতারিত হয়েছেন।"
(লেখক-মো. শেখ ফরিদ,
শিক্ষক, কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক)

