“প্রসঙ্গ যখন প্রিয় হওয়ার, তখন প্রথমেই যেন বাদ পড়ে যাই আমি"
রুহুল আমিনের আবেগঘন কবিতা 'প্রিয় তালিকায় আমি নেই' প্রকাশ করেছে একাকীত্ব ও আপনজনদের কাছে গুরুত্বহীন হওয়ার অব্যক্ত যন্ত্রণা।![]() |
| সবার হয়েও কারও না হওয়া: রুহুল আমিনের এক অব্যক্ত অভিমান ও কবিতার অন্তরালের নিঃসঙ্গতা” |
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি হলো কারও না কারও কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা ‘প্রিয়’ হয়ে ওঠা। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা যখন অপূর্ণ থেকে যায়, তখন বুকের ভেতর জন্ম নেয় এক অদ্ভুত শূন্যতা। ঠিক এমনই এক অব্যক্ত যন্ত্রণা, অভিমান এবং আত্মজিজ্ঞাসার গল্প এবার উঠে এসেছে কবি রুহুল আমিনের চমৎকার একটি কবিতায়, যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে— ‘প্রিয় তালিকায় আমি নেই’। কবিতাটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এমন এক মানুষের আক্ষেপ, যে কি না আজীবন অন্যদের আপন করে নিয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে কারও গল্পের মূল চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি। কবিতার শুরুতেই একটি অত্যন্ত গভীর এবং বাস্তবমুখী কথা বলা হয়েছে— “প্রসঙ্গ যখন প্রিয় হওয়ার, তখন প্রথমেই যেন বাদ পড়ে যাই আমি।” এই একটি লাইন যেন বর্তমান সমাজের অসংখ্য একাকী মানুষের মনের কথা। কবি এখানে এমন এক নিঃসঙ্গতার ছবি এঁকেছেন, যেখানে একজন মানুষ বারবার বন্ধু বা কাছের মানুষদের প্রিয় তালিকায় নিজের একটু জায়গা খোঁজে, কিন্তু প্রতিবারই তাকে ফিরতে হয় শূন্য হাতে। রুহুল আমিন তার লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন জীবনের এক রূঢ় বাস্তবতা। অনেক পথ পেরিয়ে, অনেক মানুষকে নিজের করে নেওয়ার পরও যখন কেউ বুঝতে পারে যে সে আসলে কারও কাছেই বিশেষ কেউ নয়, তখন যে হতাশা গ্রাস করে, তা এই কবিতায় অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। কবি নিজের দিকেই আঙুল তুলে প্রশ্ন করেছেন, “হয়তো সমস্যাটা সত্যিই আমারই।” শত শত প্রিয় তালিকায় নিজের নাম না দেখতে দেখতে একসময় অপ্রিয় হয়ে থাকাটাই যেন তার কাছে এক স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত হতে হতে মানুষের ভেতরকার অভিমানগুলো একসময় কীভাবে নীরবতায় রূপ নেয়, কবিতাটি তার এক নিখুঁত দলিল। এখন আর কেউ ভুলে গেলে তার কষ্ট হয় না। তবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে যে প্রশ্ন জাগে— “আমি কি সত্যিই এতটাই অপ্রয়োজনীয়, নাকি আমাকে ভালোবাসার মানুষটাই কখনো আমার জীবনে আসেনি?”— তা যেকোনো পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। কবিতার শেষ ভাগে এসে এক অদ্ভুত পরিণত মনস্তত্ত্বের দেখা মেলে। যেখানে আর কারও প্রিয় হওয়ার কোনো তীব্র বাসনা নেই, বরং জন্ম নিয়েছে এক নতুন আকাঙ্ক্ষা। কবি শুধু চান, অন্তত এমন কেউ একজন তার জীবনে আসুক, যে তাকে হারানোর ভয়ে ভীত হবে। “সবার হয়েও—কারও হতে পারিনি”— এই অমোঘ সত্য মেনে নিয়ে ভালোবাসার এক ভিন্ন মাত্রার কথা বলে শেষ হয়েছে রুহুল আমিনের এই আবেগঘন সাহিত্যকর্মটি। যারা জীবনে সবার আপন হতে চেয়েও দিনশেষে একাকীত্বের স্বাদ পেয়েছেন, এই কবিতাটি যেন তাদেরই জীবনের না বলা এক দীর্ঘশ্বাস।

