বাংলাদেশের ‘শাকিরা’ খ্যাত নুসরাত জাহান কৃতি: চার বছরের ছোট্ট মঞ্চ থেকে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন
বাংলাদেশের 'শাকিরা' খ্যাত নুসরাত জাহান কৃতির চার বছর বয়স থেকে শুরু হওয়া সঙ্গীত যাত্রা এবং 'ভয়েস অব বাংলাদেশ' মঞ্চে তার স্বপ্নজয়ের এক্সক্লুসিভ গল্প।![]() |
| অনেকেই আমাকে বাংলাদেশের ‘শাকিরা’ বলেও ডাকেন: নুসরাত জাহান কৃতি |
আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব এমন একজন শিল্পীর গল্প, যিনি শৈশব থেকেই সঙ্গীতের সুরে নিজের জীবনকে বেঁধেছেন এবং বর্তমানে বাংলাদেশের ‘শাকিরা’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। মাত্র চার বছর বয়সে যখন সাধারণ শিশুরা ঠিকমতো কথা গুছিয়ে বলতে শেখে না, তখন তিনি বাবার হাত ধরে প্রথমবার মঞ্চে উঠেছিলেন। সেই ছোট্ট বয়সেই নিজের জাদুকরী কণ্ঠের মাধ্যমে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন উপস্থিত সবাইকে। জীবনের প্রথম পরিবেশনাতেই তৎকালীন এডিডাস কোম্পানির চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পুরস্কারস্বরূপ পেয়েছিলেন পাঁচ হাজার টাকার একটি চেক। এই অবিশ্বাস্য অর্জনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল নুসরাত জাহান কৃতির সঙ্গীত জীবনের এক অবিস্মরণীয় যাত্রা। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোট্ট কৃতি আজ আরও পরিণত এবং আত্মবিশ্বাসী। বর্তমানে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ’-এর মঞ্চে নিজের প্রতিভার এক নতুন মাত্রা যোগ করে মৌলিক গান নিয়ে শ্রোতাদের হৃদয় জয় করার লক্ষ্যে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। কৃতির জীবনে সঙ্গীত কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তার রক্তে মিশে থাকা এক পারিবারিক ঐতিহ্য। তার বাবা ছিলেন বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের একজন নিয়মিত এবং তালিকাভুক্ত শিল্পী। বাবার নিজস্ব একটি গানের দলও ছিল। মূলত বাবার সেই সাঙ্গীতিক পরিবেশ ও অনুপ্রেরণাতেই ছোটবেলা থেকে সুরের ভুবনে পা রাখেন কৃতি। বাংলা ভাষার পাশাপাশি তিনি অনায়াসে সাত থেকে আটটি ভিন্ন ভাষায় গান পরিবেশন করতে সক্ষম। তার এই অসাধারণ প্রতিভা এবং ভিন্নধর্মী গায়কীর কারণেই ভক্তরা তাকে ভালোবেসে বাংলাদেশের ‘শাকিরা’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে নানাবাড়িতে জন্ম এবং সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। শিক্ষাজীবনেও তিনি অনন্য মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সফলভাবে সম্পন্ন করার পর তিনি ভর্তি হন সরকারি সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই নজরুল গীতি ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া এই মেধাবী শিল্পী পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতা ও শান্তিনিকেতনেও নিজের সঙ্গীত পরিবেশন করার বিরল সুযোগ লাভ করেছেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঙ্গীতের এই জগতে প্রবেশের গল্পটি ছিল বেশ চমকপ্রদ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাণিজ্য বিভাগের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী। পরবর্তীতে বাবার ঐকান্তিক ইচ্ছাতেই তিনি সরকারি সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে এই বিষয়ের প্রতি খুব একটা টান না থাকলেও ধীরে ধীরে সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের চমৎকার পরিবেশ, দক্ষ শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান এবং একই ছাদের নিচে বিভিন্ন ধারার গান শেখার অপূর্ব সুযোগ তার চিন্তাধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। কৃতির নিজের জবানীতে, সেই সময়টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে সোনালী এবং স্মরণীয় অধ্যায়। সেখানে একই সাথে নজরুল, রবীন্দ্র, লোকগীতি এবং ক্ল্যাসিক্যালের মতো বৈচিত্র্যময় সুরের শিক্ষা গ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ ছিল। শিক্ষার্থীরা মেঝেতে বসে অত্যন্ত সাধারণ পরিবেশে ক্লাস করতেন এবং বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা একত্রে মিলিত হয়ে সঙ্গীতের চর্চা করতেন। এই অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশই সঙ্গীতকে তার আত্মার সাথে চিরতরে গেঁথে দেয়। কৃতির এই দীর্ঘ এবং সফল পথচলায় তার পরিবারের নিঃশর্ত সমর্থন ছিল অপরিসীম। বাবা-মায়ের পাশাপাশি তার মামা, খালা এবং ভাইবোনেরাও সঙ্গীতের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তাদের পারিবারিক যেকোনো আয়োজনে নিয়মিতভাবে গানের আসর বসে, যা তার সঙ্গীত চর্চাকে আরও বেগবান করেছে। এমন একটি সাঙ্গীতিক আবহে বেড়ে ওঠার কারণেই গান আজ তার কাছে নিছক কোনো পেশা নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে কৃতির ব্যাপক জনপ্রিয়তার অন্যতম একটি বড় কারণ হলো ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ’। তার দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়, বরং একজন প্রকৃত শিল্পীকে নতুন করে আবিষ্কার করার একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে পৌঁছানোর জন্য একজন শিল্পীকে বছরের পর বছর ধরে নিরলস সাধনা করতে হয়। এই প্রতিযোগিতার শীর্ষ দশে জায়গা করে নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বিভিন্ন সঙ্গীত প্রতিযোগিতা সম্পর্কেও তার প্রবল আগ্রহ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার চোখে এখন এক বিশাল স্বপ্ন। তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পপ তারকা শাকিরার সাথে অন্তত একটি গানে কণ্ঠ মেলাতে চান। এই স্বপ্নটি আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছে অনেক বড় মনে হলেও কৃতি এটিকে মোটেও অসম্ভব বলে মনে করেন না। তার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি স্বপ্নের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, নিরলস প্রচেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার অদম্য মানসিকতা থাকে, তবে যেকোনো স্বপ্নই একদিন বাস্তবে রূপ নিতে বাধ্য। দীর্ঘকাল ধরে কৃতি মূলত কভার গানেই বেশি অভ্যস্ত ছিলেন এবং এর মাধ্যমেই তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে অগণিত শ্রোতার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পাওয়ার পর তিনি এখন মৌলিক গানেই সবচেয়ে বেশি মনোনিবেশ করতে চাইছেন। তিনি জানিয়েছেন, কভার গানের পাশাপাশি এখন থেকে তিনি নিজের তৈরি কিছু কালজয়ী গানও শ্রোতাদের উপহার দিতে চান। কৃতির স্বপ্ন অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তিনি এমন কিছু অবিস্মরণীয় গান সৃষ্টি করতে চান, যেগুলো শুধু বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতারাই নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও অত্যন্ত আগ্রহের সাথে গাইবে। তিনি যেমন আজ অন্যান্য গুণী শিল্পীদের গান পরিবেশন করে আনন্দ পান, ঠিক তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীরাও একদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারই গান পরিবেশন করবে—এমনটাই তার ঐকান্তিক প্রত্যাশা। আর এভাবেই নিজের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি অনন্তকাল বেঁচে থাকার এক ঐশ্বরিক অনুভূতি লাভ করতে চান। চার বছর বয়সের সেই ছোট্ট মঞ্চ থেকে প্রাপ্ত প্রথম স্বীকৃতি আজ তাকে ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ’-এর মতো বিশাল মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়েছে। কৃতির জীবনযাত্রা এখন এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। তার বর্তমান লক্ষ্য হলো নিজের মৌলিক গান তৈরি করা, সঙ্গীতের নিজস্ব একটি শক্ত পরিচয় গড়ে তোলা এবং একদিন লালিত সেই স্বপ্নের বিশ্বমঞ্চে নিজেকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করা।

