দেশীয় প্রযুক্তিতে অত্যাধুনিক ড্রেজার উদ্ভাবন: মুহুরী-কহুয়া মেগা প্রকল্পে উদ্যোক্তা মাজাহার চৌধুরীর চমক
ফেনীর মুহুরী-কহুয়া মেগা প্রকল্পে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সাশ্রয়ী ড্রেজার ব্যবহার করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন উদ্যোক্তা মাজাহার চৌধুরী।![]() |
| দেশীয় প্রযুক্তিতে ড্রেজার তৈরি করে আলোচনায় উদ্যোক্তা মাজাহার চৌধুরী |
১ অক্টোবর ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে দেশবাসী। এদিন বহুল প্রতীক্ষিত ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এই মেগা প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঘাটঘর এবং মুহুরী নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন সাজ সাজ রব। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন মাজাহার চৌধুরী নামের এক অদম্য উদ্যোক্তা। সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা ও দেশীয় প্রযুক্তির সমন্বয়ে তিনি এমন এক ড্রেজার বা খননযন্ত্র তৈরি করেছেন, যা বর্তমানে এই মেগা প্রকল্পের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।মাজাহার চৌধুরী কেবল একজন সাধারণ ড্রেজার ব্যবসায়ী নন, তিনি একাধারে একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ও উদ্ভাবক। বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে দেশীয় কাঁচামাল ও মেধার সঠিক ব্যবহার করা যায়, সেই চিন্তাধারা থেকেই তিনি এই ড্রেজার নির্মাণের যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার নির্মিত এই অত্যাধুনিক ড্রেজারগুলো প্রচলিত বিদেশি মেশিনের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী। নির্মাণ ব্যয় থেকে শুরু করে দৈনন্দিন পরিচালনা খরচ—সব দিক থেকেই এটি অত্যন্ত লাভজনক বলে দাবি করেছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা। তার মূল লক্ষ্যই হলো দেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে এমন একটি কার্যকরী খননযন্ত্র তৈরি করা, যা তুলনামূলক কম খরচে সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করতে সক্ষম।এই দেশীয় ড্রেজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর মডুলার বা খণ্ডনযোগ্য গঠনশৈলী। মাজাহার চৌধুরী জানিয়েছেন, মেশিনটিকে এমন নিপুণভাবে নকশা করা হয়েছে যে, এর বিভিন্ন অংশ খুব সহজেই আলাদা করা যায় এবং পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় জোড়া লাগানো সম্ভব। এই সুবিধার কারণে দেশের যেকোনো প্রত্যন্ত অঞ্চল, সরু খাল বা নদীর দুর্গম পয়েন্টে মেশিনটি অনায়াসেই পরিবহন করা যায়। ফলশ্রুতিতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ড্রেজার স্থানান্তরের ক্ষেত্রে যেমন মূল্যবান সময় বাঁচে, তেমনি পরিবহন খরচও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এটি নদীমাতৃক বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য এক অনন্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে উদ্বোধন হতে যাওয়া এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নিজের তৈরি ড্রেজার ব্যবহৃত হওয়ায় আবেগাপ্লুত মাজাহার চৌধুরী। তিনি এটিকে তার জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, দেশের মাটিতে নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রেজার তৈরি করতে পারাটা তার জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়। বর্তমানে তার মালিকানাধীন একাধিক ড্রেজার বিভিন্ন স্থানে সফলভাবে কাজ করছে। ভবিষ্যতে এই দেশীয় প্রযুক্তিকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করে দেশের অন্যান্য মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও নিজের উদ্ভাবিত মেশিন ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পটি ফেনী অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। এমন একটি মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত আনন্দিত।উল্লেখ্য, মুহুরী-কহুয়া নদী ও এর আশপাশের বিস্তীর্ণ জনপদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সেচ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার বিশাল বাজেটে অনুমোদিত এই প্রকল্পের অধীনে মূলত নদী ও জলাধারগুলোর ব্যাপক পুনঃখনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের আধুনিকায়ন ও পুনর্বাসন, নদীভাঙন রোধে তীর সংরক্ষণ এবং সেচ অবকাঠামোর সার্বিক সংস্কার করা হবে। এই বিপুল কর্মযজ্ঞে মাজাহার চৌধুরীর মতো একজন প্রযুক্তিপ্রেমী উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশিরাও উদ্ভাবনী শক্তিতে যেকোনো অসাধ্য সাধন করতে পারে। তার এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিভিত্তিক নির্মাণ সক্ষমতা এবং স্বনির্ভরতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

