ঢাকার কাছেই ধলেশ্বরীর তীরে 'জল কাচারি': পূজার ছুটিতে নাগরিক কোলাহল থেকে মুক্তির এক আদর্শ গন্তব্য
ঢাকার কাছে কেরানীগঞ্জে ধলেশ্বরী নদীর তীরে গড়ে ওঠা 'জল কাচারি' হতে পারে পূজার ছুটিতে আপনার সেরা ভ্রমণ গন্তব্য। জেনে নিন বিস্তারিত।নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা আর কংক্রিটের বন্দিদশা থেকে হাঁপিয়ে ওঠা মন সবসময়ই একটু প্রশান্তি খোঁজে। ইট-পাথরের এই রাজধানী ঢাকার খুব কাছেই যদি এমন কোনো জায়গা থাকে, যেখানে নদীর শান্ত জল আর নীল আকাশ একাকার হয়ে যায়, তবে কেমন হয়? ঠিক এমনই এক নৈসর্গিক ও চোখজুড়ানো গন্তব্য হলো কেরানীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীর তীরে গড়ে ওঠা 'জল কাচারি-ধলেশ্বরী'। আসন্ন পূজার টানা ছুটিতে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসার জন্য এটি হতে পারে আপনার সেরা একটি গন্তব্য। প্রথম দেখায় যে কারও মনে হতে পারে, এটি হয়তো গতানুগতিক কোনো রিসোর্ট। কিন্তু সেখানে পা রাখতেই আপনার চোখের সামনে উন্মোচিত হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্রপট। রাজধানীর সীমানা থেকে খুব বেশি দূরে না গিয়েও একেবারে নদীর বুক ঘেঁষে সময় কাটানোর এমন অভাবনীয় সুযোগ সত্যিই বিরল। চারপাশে নেই কোনো ইট-পাথরের জঞ্জাল কিংবা কোলাহল। কেবল সবুজ প্রকৃতি, মুক্ত আকাশ এবং ধলেশ্বরী নদীর অবিরাম বয়ে চলা—সব মিলিয়ে এক অনন্য ছুটির ঠিকানা এই 'জল কাচারি'। এই কটেজের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো নদীর ওপর নির্মিত দীর্ঘ কাঠের ডেক বা পাটাতন। এই পাটাতনে পা দুলিয়ে বসে আপনি অনায়াসেই কাটিয়ে দিতে পারেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাঝখানে রয়েছে টিনের ছাউনিযুক্ত একটি চমৎকার বসার স্থান। সেখানে বসে প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠার পাশাপাশি উপভোগ করতে পারবেন নদীর স্নিগ্ধ সমীরণ ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য। নদীর তীর ঘেঁষে কটেজের দুই প্রান্তে রয়েছে দুটি বিশেষ ‘সানসেট রুম’। এই কক্ষগুলো থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এছাড়া, দোলনায় দুলতে দুলতে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থেকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করবেন আগত দর্শনার্থীরা। কীভাবে গড়ে উঠল এই দৃষ্টিনন্দন স্থানটি? জানা যায়, এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন ইমরুল খান। করোনা মহামারির ঘরবন্দি জীবন তাঁকে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে উপলব্ধি করতে বাধ্য করে। একসময় তিনি বিডি সাইক্লিস্টদের সঙ্গে এই এলাকায় সাইকেল চালাতে এবং নদীর তীরে ক্যাম্পিং করতে আসতেন। তখন এখানে তাঁর এক পরিচিতজনের একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর ছিল। ২০২৩ সালের শেষ ভাগে এসে সেই পরিত্যক্ত স্থানটিকে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর পরিকল্পনা করেন তিনি। এরপর ২০২৪ সালে শুরু হয় এর নির্মাণকাজ। প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতরাই এখানে আসতেন। তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সাধারণ পর্যটকদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে এটি পারিবারিক পুনর্মিলনী, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা যেকোনো দলবদ্ধ আয়োজনের জন্য একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানে শুধু চোখজুড়ানো প্রকৃতিই নয়, খাবারের পরিবেশনাতেও রয়েছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে এখানে রয়েছে ডে ও নাইট—উভয় ধরনের প্যাকেজ। ডে প্যাকেজ সাধারণত সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৫টা বা ৬টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর আওতায় সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার এবং বিকেলের স্ন্যাকস সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি রয়েছে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর চমৎকার সুযোগ। আর যারা রাত্রিযাপন করতে চান, তাদের জন্য রাতের খাবার এবং পরদিন সকালের নাশতার সুবিধা যুক্ত রয়েছে নাইট প্যাকেজে। কীভাবে যাবেন এই নৈসর্গিক ঠিকানায়? ঢাকা থেকে 'জল কাচারি-ধলেশ্বরী'-এর দূরত্ব মাত্র ১৫ কিলোমিটার। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, গাবতলী কিংবা আমিনবাজার থেকে নিজস্ব গাড়ি বা সিএনজিতে করে মাত্র ২৫ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। কলাতিয়া বাজার পেরিয়ে আরও দেড় কিলোমিটার এগোলেই ঢালিকান্দি গুদারাঘাটের ঠিক পাশেই চোখে পড়বে এই কটেজ। তবে যাতায়াতের সময়টি রাস্তার পরিস্থিতি ও যানজটের ওপর নির্ভরশীল। তাই যাওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের ফেসবুক পেজে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করে অবশ্যই বুকিং নিশ্চিত করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। যান্ত্রিক শহরের কোলাহল থেকে নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে, নদীর মৃদুমন্দ হাওয়া আর প্রকৃতির অকৃত্রিম মায়ায় হারিয়ে যেতে চাইলে পূজার এই ছুটিতে নিশ্চিন্তে ঢুঁ মেরে আসতে পারেন ঢাকার কাছের এই ধলেশ্বরী নদীর পাড় থেকে। আপনাদের ভ্রমণ হোক আনন্দদায়ক ও নিরাপদ।

