মহেশখালীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অমিত সম্ভাবনা ও ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের নীতি সংলাপ সম্পন্ন
মহেশখালীতে ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ নীতি সংলাপ অনুষ্ঠিত। পরিবেশ সুরক্ষায় নাগরিক দাবিনামা উপস্থাপন করা হয়।দেশের উপকূলীয় উপজেলা মহেশখালীতে ‘জ্বালানির জন-মালিকানা ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর’ শীর্ষক এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী স্থানীয় নীতি সংলাপ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) মহেশখালী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে পরিবেশবান্ধব শক্তি ও জ্বালানি অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ‘আর্থ-সামাজিক সমৃদ্ধি অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভূমিকা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ বা জেটনেট-বিডি, পিপলস কমিশন মহেশখালী, মহেশখালী জনসুরক্ষা মঞ্চ এবং স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন সংশপ্তক যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে। এতে সার্বিক সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ। মূলত দ্রুত নগরায়ণের প্রভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ঝুঁকি এবং স্থানীয় মানুষের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার সাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অমিত সম্ভাবনাকে জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সাথে সরাসরি সংযুক্ত করাই ছিল এই মেগা আয়োজনের মূল লক্ষ্য। উল্লেখ্য, জেটনেট-বিডি মূলত দেশব্যাপী কর্মরত বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে, যার সাচিবিক দায়িত্ব পালন করছে একশনএইড বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া অঞ্চলের স্থানীয় বাস্তবতার নিরিখে সাধারণ মানুষের জ্বালানি সংকট ও নাগরিক দাবিনামা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। আলোচকরা দৃঢ়তার সাথে জানান যে, আবাসিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার স্থাপন, কমিউনিটিভিত্তিক সোলার প্যানেল তৈরি, কৃষি ও সেচ কাজে সৌরশক্তির বহুমুখী ব্যবহার এবং বায়োগ্যাস ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলো এই উপকূলীয় এলাকার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হতে পারে। এনার্জি ট্রানজিশন প্রজেক্টের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর এম এ হান্নানের সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংশপ্তকের পরিচালক অগ্রদূত দাশগুপ্ত। তিনি তার বক্তব্যে স্থানীয় জনসাধারণের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা ও প্রয়োজনকে জাতীয় নীতিমালার সাথে সমন্বয় করার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এরপর অত্যন্ত তথ্যবহুল ও গবেষণালব্ধ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জেটনেট-বিডির সদস্য সচিব এবং একশনএইড বাংলাদেশের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন কর্মসূচির ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেশের ভয়াবহ মাত্রায় নির্ভরশীলতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ ঝুঁকিগুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন। একইসাথে তিনি কক্সবাজার-২ আসনের ভৌগোলিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষিতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের জোরালো আহ্বান জানান। উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ তাদের সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেন। কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম অসীম বড়ুয়া জানান, বর্তমানে সরকারি নিয়মানুযায়ী বহুতল আবাসিক ভবনে ৩ কিলোওয়াট, শিল্প-কারখানায় মোট চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ধর্মীয় উপাসনালয় যেমন মসজিদ-মাদ্রাসায় ৫ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি উল্লেখ করে তিনি স্থানীয়ভাবে নেট-মিটারিং সুবিধা চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সবাইকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে আরো বেশি সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, মাতারবাড়ি কয়লাবিদ্যুৎ ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক মেগা প্রকল্পের কারণে স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুতি এবং জমির অবমূল্যায়নের ক্ষোভ প্রকাশ করে ন্যায্য রূপান্তরের জোর দাবি জানান সাবেক ইউপি সদস্য মোঃ হামিদ হাসান। সিটি কলেজের প্রভাষক রুহুল আমিন এই অঞ্চলের অনুকূল ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বৃহৎ আকারের বায়ুবিদ্যুৎ ও সোলার প্ল্যান্ট স্থাপনের সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সরকারের বিদ্যমান বিভিন্ন সৌর প্রকল্পগুলোর কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রভাষক কামাল হোসেন এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বিউটি সবুজ অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে নারীদের সরাসরি ও সক্রিয় অংশগ্রহণের অপরিহার্যতা সম্পর্কে আলোকপাত করেন। যুব প্রতিনিধি মিজানুর রহমান এলএনজি অবকাঠামোর ভয়াবহ পরিবেশগত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তরুণ সমাজের জন্য পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের মালিকানায় তাদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানান। সমাপনী বক্তব্যে সভাপতির আসন থেকে মোঃ বেলাল হোসেন প্রাচীনকালের প্রাকৃতিক শক্তি ব্যবহারের ইতিহাস টেনে এনে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সহায়তায় পুনরায় টেকসই জ্বালানির দিকে ফিরে যাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই সংলাপে উঠে আসা স্থানীয় মতামত, প্রস্তাবনা ও নাগরিক দাবিগুলো সুসংগঠিত করে কক্সবাজার-২ আসনের সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে। মহেশখালী ও কুতুবদিয়া এলাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটাতে পারলে তা কেবল বর্তমান জ্বালানি সংকটই মোকাবিলা করবে না, বরং শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ, বেকারত্ব দূরীকরণ, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি এবং সর্বোপরি স্থানীয় অর্থনীতিকে এক সুদৃঢ় ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে বলে উপস্থিত সকলেই গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

