নামজা'রির ফাইলে থাকে 'সাংকেতিক চিহ্ন'
মিরসরাই ভূমি অফিসে নামজারির নামে চলছে দালালদের রমরমা বাণিজ্য। সাংকেতিক চিহ্নে ঘুস লেনদেন ও হয়রানির বিস্তারিত জানুন আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদনে।মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং উপজেলা ভূমি অফিসগুলো যেন এখন অনিয়ম আর দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত সেবা প্রাপ্তির এই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অত্যন্ত সুকৌশলে গড়ে উঠেছে দালালদের এক বিশাল ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট। প্রাপ্ত তথ্যমতে, উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভার বিশাল জনগোষ্ঠীর সেবা নিশ্চিত করতে নির্ধারিত আটটি তপশিল বা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অন্তত পাঁচ শতাধিক দালাল অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে। এই দালাল চক্রের সঙ্গে অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের রয়েছে গোপন আঁতাত। তাদের সাথে মোটা অঙ্কের অর্থের রফা না হলে সেবাগ্রহীতাদের নামজারি বা মিউটেশনের ফাইলে পদে পদে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয়টি হলো দালালদের ফাইলের বিশেষ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া। অনুসন্ধানে জানা যায়, দালালদের মাধ্যমে জমা হওয়া নামজারি, মিস মামলা বা অন্যান্য ভূমি সংক্রান্ত ফাইলের এক কোণায় নির্দিষ্ট কিছু সাংকেতিক চিহ্ন বা কোড ব্যবহার করা হয়। এই বিশেষ দাগ বা সংকেত দেখেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা সহজেই বুঝে নেন যে এটি তাদের নিজস্ব চুক্তির ফাইল। ফলস্বরূপ, ওই ফাইলগুলো জাদুর মতো দ্রুতগতিতে নিষ্পত্তি হয়ে যায়। অন্যদিকে, যেসব সাধারণ নাগরিক কোনো মধ্যস্থতাকারী বা দালাল ছাড়াই সরাসরি নিজেদের আবেদন জমা দেন, তাদের ফাইলের ভাগ্যে জোটে অন্তহীন হয়রানি। ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি নিয়মানুযায়ী একটি সাধারণ নামজারির জন্য ফিস নির্ধারিত রয়েছে মাত্র এক হাজার একশ টাকা। কিন্তু বাস্তবে এই দালাল চক্রের মাধ্যমে কাজ করাতে গেলে সরকারি ফি বাদেও সর্বনিম্ন ছয় হাজার থেকে শুরু করে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ঘুস হিসেবে গুনতে হয়। আর সেই দলিল যদি কোনো কারণে একটু জটিল বা বেশ পুরোনো হয়, তবে এই খরচের পরিমাণ কয়েকগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘুষের এই ভাগাভাগির প্রক্রিয়াটিও একেবারে সুনির্দিষ্ট করা আছে। ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা তপশিল অফিস থেকে নামজারির প্রস্তাবটি উপজেলা পর্যায়ে পাঠাতেই সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়। এরপর সেই প্রস্তাব যখন উপজেলা ভূমি অফিসে পৌঁছায়, তখন চূড়ান্ত অনুমোদন এবং খতিয়ান সংগ্রহের জন্য আরও অন্তত তিন হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়। এভাবেই ধাপে ধাপে সরকারি ফি-এর চেয়ে পাঁচ থেকে দশগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের পুরোনো দলিল, মহামান্য আদালতের কোনো রায় কিংবা একাধিক ওয়ারিশ রয়েছে এমন সম্পত্তির ক্ষেত্রে দালালরা ইচ্ছামতো অর্থের অঙ্ক দাবি করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে তপশিল অফিস থেকে শুরু করে উপজেলা ভূমি অফিস পর্যন্ত রীতিমতো প্রকাশ্য দরকষাকষির এক জঘন্য সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই অনিয়মের শিকার অসংখ্য ভুক্তভোগী তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। ওয়াহেদপুর এলাকার বাসিন্দা আশরাফ নিজামী অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান, ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া পৈতৃক সম্পত্তির নামজারির জন্য আবেদন করার পর তপশিল অফিস থেকে তার কাছে সরাসরি দশ হাজার টাকা দাবি করা হয়। তিনি এত বিপুল পরিমাণ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার আবেদনটি ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি না করায় এক পর্যায়ে তার আবেদনের মেয়াদই শেষ হয়ে যায়, যার ফলে বাধ্য হয়ে তাকে সম্পূর্ণ নতুন করে আবারও আবেদন করতে হয়েছে। আরেকজন ভুক্তভোগী আব্দুল মান্নান তার চরম হতাশার কথা জানিয়ে বলেন, মেয়ের স্বামীর জমির নামজারির জন্য আবেদন করার পর এক কর্মকর্তা তার কাছে প্রথমে চল্লিশ হাজার টাকা দাবি করে বসেন। অনেক অনুনয়-বিনয় করার পর শেষমেশ তা পঁচিশ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তার ফাইলে কাল্পনিক নানা ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে আবেদনটি সরাসরি বাতিল করে দেওয়া হয়। একইভাবে মিহির দাশ নামের আরেক আবেদনকারী জানান, অনেক কষ্ট করে কেনা জমির নামজারির জন্য তিনি আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কোনো ধরনের যৌক্তিক কারণ ছাড়াই তার আবেদনটি বাতিল করা হয়। অনলাইনে চেক করে তিনি দেখতে পান আবেদনটি নামঞ্জুর করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে কোনো নির্দিষ্ট কারণ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। নেপাল নাথ নামের আরেক সেবাপ্রার্থী জানান এক অদ্ভুত বৈষম্যের কথা। তিনি এবং তার ভাই একই ধরনের দুটি আবেদন করেছিলেন। কিন্তু মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেন করায় তার নামজারিটি খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায়, অথচ টাকা কম দেওয়ায় তার ভাইয়ের আবেদনটি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, এখানে কাগজপত্রের বৈধতার চেয়ে টাকার জোরই আসল। এদিকে, এই ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াহেদপুর তপশিল অফিসের তহসিলদার দিদারুল আলম অত্যন্ত কৌশলে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ফোনে কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি অফিসে এসে দেখা করার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড আলাউদ্দিন কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, তার কাছে কেউ এখনো পর্যন্ত টাকা লেনদেনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি। তবে কেউ যদি সুস্পষ্ট প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ দেন, তবে অবশ্যই সুষ্ঠু তদন্ত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, ইতোমধ্যে ব্যাপক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে একজন তহসিলদারের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে তিনি এও বলেন যে, অনেক সময় আরএস খতিয়ান এবং বিএস খতিয়ানের মধ্যে জমির হিস্যার বা অংশের ব্যাপক অসংগতি থাকে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের ঝুঁকি এড়াতেই এসব বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আবেদন যাচাই-বাছাই করা হয়। তবে তার এই বক্তব্যের পরও ভূমি অফিসে আসা সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, দালাল ধরলে সেই অসংগতিগুলো কীভাবে রাতারাতি বৈধ হয়ে যায়? এই সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে মিরসরাইয়ের সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তির কোনো শেষ হবে না। একটি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত ভূমি প্রশাসন নিশ্চিত করতে হলে ঊর্ধ্বতন মহলের কঠোর নজরদারি এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই।

