রৌমারী ভূমি অফিসে চরম দুর্নীতি: ৬ লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই সাজানো রায় প্রদান
রৌমারী ভূমি অফিসে ৬ লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় তারিখের আগেই রায় প্রদানের অভিযোগ। এসিল্যান্ড ও কর্মচারীদের দুর্নীতির এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ।
প্রকাশঃ
প্রিয় দর্শক, ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের হয়রানি ও দুর্নীতির অভিযোগ যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে উঠেছে এক গুরুতর অভিযোগ। ন্যায়বিচারের আশায় গিয়ে উল্টো চরম অবিচারের শিকার হয়েছেন এক ভুক্তভোগী। অভিযোগ উঠেছে, খোদ সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড এবং তার অধস্তন কর্মচারীরা যোগসাজশ করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একটি মামলার রায় পাল্টে দিয়েছেন। ভুক্তভোগী জমির উদ্দিনের অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত ১৮ মার্চ তিনি তার জমি সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানির পরবর্তী তারিখ জানতে রৌমারী ভূমি অফিসে যান। সেখানে এসিল্যান্ড রাফিউর রহমান তাকে প্রধান সহকারী তপন কুমার এবং চেইনম্যান এনামুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী তাদের কাছে গেলে তারা জানান যে, আগামী ৬ মে শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। কিন্তু রায় নিজেদের পক্ষে নিতে হলে 'খরচাপাতি' বাবদ ৬ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হবে। এই ঘুষ দাবির সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামান বদর। তিনি এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ভুক্তভোগী জমির উদ্দিনের দাবি, ৬ মে শুনানির তারিখ নির্ধারিত থাকলেও এসিল্যান্ড এবং তার কার্যালয়ের কর্মচারীরা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে, নির্ধারিত তারিখের অনেক আগেই, অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল তারা তড়িঘড়ি করে প্রতিপক্ষের পক্ষে একটি সাজানো রায় প্রদান করে। অত্যন্ত বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই রায়ের কপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে বিবাদীপক্ষ অর্থাৎ জমির উদ্দিনরা শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের দাখিলকৃত কাগজপত্র ভুয়া। অথচ জমির উদ্দিন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই পাননি। এমনকি আদালতের বৈধ রায়ের কপি থাকার পরও এসিল্যান্ড সেটিকে ভুয়া বলে চালিয়ে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জমির উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, সকল বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ঘুষের টাকা দিতে না পারায় তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে এই ঘৃণ্য ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রায়ের কপি হাতে পেয়ে এসিল্যান্ডের কাছে গেলে তিনি অত্যন্ত দায়সারাভাবে তাদেরকে আপিল করার পরামর্শ দিয়ে বিদায় করেন। ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন এই চরম দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছে। এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামান বদর অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন কতটা বেপরোয়া হয়ে প্রকাশ্যে ঘুষ দাবি করছেন, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তার উপস্থিতিতেই ভূমি অফিসের ওই কর্মচারীরা ভুক্তভোগীর কাছে ৬ লাখ টাকা দাবি করেছিল এবং স্পষ্ট জানিয়েছিল যে টাকা দিলেই কেবল রায় পক্ষে যাবে। রৌমারী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও কলেজ শিক্ষক আবুল হাসেম এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বর্তমান এসিল্যান্ড শুধুমাত্র সরকারের স্বার্থ দেখেন, কিন্তু সাধারণ জনগণের স্বার্থ বা ন্যায়বিচারের প্রতি তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এই ভূমি অফিসটি এখন দুর্নীতির এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাকের ডগায় এমন অনিয়ম চললেও তারা পুরোপুরি নির্বিকার ভূমিকা পালন করছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে অভিযুক্ত কর্মচারীরা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অফিসের চেইনম্যান এনামুল হক এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হয়ে এসিল্যান্ডের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, প্রধান সহকারী তপন কুমার দাবি করেন যে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তবে এসিল্যান্ড বা চেইনম্যান কোনো আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে এড়িয়ে যান। পুরো বিষয়টি নিয়ে রৌমারীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাফিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘুষ গ্রহণের অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তার ভাষ্যমতে, তিনি নথিপত্র পর্যালোচনা করে যা সঠিক মনে করেছেন, সেই অনুযায়ী রায় দিয়েছেন। রায় বিপক্ষে যাওয়ায় সংক্ষুব্ধ পক্ষ এখন মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। তাদের কোনো আপত্তি থাকলে তারা রিভিউ আবেদন করতে পারেন। এদিকে, এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের বক্তব্য জানার জন্য তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার তরফ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে রৌমারী ভূমি অফিসের এই নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

