মোগল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন ফেনীর চাঁদগাজী ভূঁইয়া জামে মসজিদ:
ফেনীর ছাগলনাইয়ায় অবস্থিত মোগল আমলের ঐতিহাসিক চাঁদগাজী ভূঁইয়া জামে মসজিদ। ১৭১২ সালে নির্মিত এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অজানা ইতিহাস জানুন।বাংলাদেশের এমন এক ঐতিহাসিক স্থানে, যা শত শত বছর ধরে আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার মহামায়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়টির নাম ঐতিহাসিক চাঁদগাজী ভূঁইয়া জামে মসজিদ, যা অনেকের কাছে চাঁদ খাঁ মসজিদ নামেও সুপরিচিত। মোগল সাম্রাজ্যের গৌরবময় স্থাপত্য রীতির এক অনবদ্য স্মারক হিসেবে এই স্থাপনাটি আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে চলেছে। এই দৃষ্টিনন্দন মসজিদটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে আভিজাত্য ও শিল্পের ছোঁয়া। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোগল আমলের প্রতাপশালী জমিদার এবং বাংলার বীর বারো ভূঁইয়াদের সুযোগ্য উত্তরসূরি চাঁদগাজী ভূঁইয়া এই চমৎকার উপাসনালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মসজিদটির প্রধান ফটকের উপরিভাগে স্থাপিত একটি কালো পাথরের প্রাচীন নামফলক থেকে এর নির্মাণকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। সেই ফলকের লিপি অনুযায়ী, ১১১২ হিজরি মোতাবেক ১৭১২ থেকে ১৭১৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে এই ঐতিহাসিক ইমারতটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছিল। স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে এটি মোগল রীতির এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। এর ছাদের ওপর রয়েছে তিনটি সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ, যার মধ্যে মাঝের গম্বুজটি অন্য দুটির তুলনায় বেশ বড় এবং আকর্ষণীয়। শুধু গম্বুজই নয়, চারপাশ ও মাঝখান মিলিয়ে মোট ১২টি সুউচ্চ মিনার বা স্মৃতিস্তম্ভ মসজিদটির সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রাচীনকালের কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়া চোখে পড়ে এর নির্মাণ সামগ্রীতেও। সে যুগের ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র আকারের ইট, চুন এবং সুরকির নিখুঁত মিশ্রণে অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে এই স্থাপনাটি তৈরি করা হয়েছিল। মসজিদের মূল প্রবেশদ্বার এবং ভেতরের দেয়ালগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা মেলে চমৎকার সব টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কারুকাজের। ফুল, লতাপাতা এবং নানা ধরনের দৃষ্টিনন্দন নকশায় সাজানো এই দেয়ালগুলো যেন সেকালের শিল্পীদের শৈল্পিক মনের কথা বলে। বর্তমানে এই অমূল্য রত্নটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। এটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি আমাদের শিকড় এবং গৌরবোজ্জ্বল অতীতের এক জীবন্ত দলিল। এমন প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আমাদের আগামী প্রজন্মও বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

