টিকটক তারকা বানানোর ফাঁদে ফেলে কিশোরীকে পতিতালয়ে বিক্রি
ফরিদপুরে টিকটক মডেল বানানোর ফাঁদে ফেলে কিশোরীকে পতিতালয়ে বিক্রির দায়ে এক পাচারকারীকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।![]() |
| ফরিদপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত | ছবি সংগৃহীত |
টিকটক তারকা কিংবা গ্ল্যামারাস মডেল হওয়ার রঙিন স্বপ্ন! আর এই স্বপ্নের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল অন্ধকার এক ফাঁদ। ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে সোজা পতিতালয়ের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বিক্রি করে দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেছে আদালত। ফরিদপুরে ঘটে যাওয়া অমানবিক এই মানব পাচারের ঘটনায় আদল কাজী নামক ৫৪ বছর বয়সী এক পাচারকারীকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। সোমবার (১১ মে) দুপুরে ফরিদপুরের মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং জেলা ও দায়রা জজ শামীমা পারভীন জনস্বার্থে এই যুগান্তকারী রায়টি ঘোষণা করেন। আদালত সূত্রে জানা যায়, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের দুটি পৃথক ধারায় আসামিকে এই শাস্তি প্রদান করা হয়। যার মধ্যে ১০ নম্বর ধারায় ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে, একই আইনের ১১ নম্বর ধারায় অপরাধীকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সমপরিমাণ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, যা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সাজা ভোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারকের নির্দেশ অনুযায়ী, আসামির দুটি সাজা একই সঙ্গে কার্যকর হবে, ফলে তাকে সর্বমোট সাত বছর কারাভোগ করতে হবে। তবে রায় ঘোষণার সময় মূল আসামি আদল কাজী পলাতক ছিলেন বলে আদালত নিশ্চিত করেছে। দণ্ডপ্রাপ্ত এই অপরাধীর পুরো নাম আদল কাজী। সে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার অধীনস্থ পূর্ব গঙ্গাবর্দী গ্রামের মৃত ইমান কাজীর ছেলে। দীর্ঘ সময় ধরে সে সংঘবদ্ধ এক মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছিল। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ২০২১ সালের ২০ জুলাই। মামলার নথিপত্র এবং পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। ১৬ বছর বয়সী ওই অসহায় কিশোরীর চোখে মডেলিং জগতের জৌলুসপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন বুনে দেয় আদল কাজী। তাকে জনপ্রিয় টিকটক তারকা বানানোর মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বাড়ি থেকে সুকৌশলে অপহরণ করে সে। এরপর ওই কিশোরীকে নিয়ে যাওয়া হয় ফরিদপুর শহরের রথখোলা এলাকার একটি পতিতালয়ে। সেখানে তাকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং টানা কয়েকদিন আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতনের পাশাপাশি জোরপূর্বক দেহব্যবসা করতে বাধ্য করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই লোমহর্ষক ঘটনার খবর পৌঁছায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এরপর ২০২১ সালের ২৭ জুলাই গভীর রাতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৮)-এর একটি চৌকস আভিযানিক দল রথখোলা এলাকার ওই পতিতালয়ে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করে। সফল এই অভিযানে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করা হয় ভুক্তভোগী কিশোরীকে, আর সেই রাতেই হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় মানব পাচারকারী আদল কাজীকে। পরবর্তীতে, র্যাব-৮ এর তৎকালীন ডিএডি মো. আবুল বাশার বাদী হয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলাটিতে সুমন ওরফে রাসেল নামের আরেক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। মামলার দায়িত্বভার গ্রহণ করে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শ্রী প্রসাদ কুমার চাকী নিবিড়ভাবে তদন্ত শুরু করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিলকৃত প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, আদল কাজী দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক ভয়ংকর নারী পাচার চক্রের হোতা। সে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সহজ-সরল নারীদের মিথ্যা প্রলোভনে ফেলে দেহব্যবসায় বাধ্য করত। তবে মামলার অন্য আসামি সুমনের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা এবং পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় চার্জশিটে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন করা হয়েছিল। চূড়ান্ত বিচারে কেবল আদল কাজীর বিরুদ্ধেই বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং আজ তার এই দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলো।

